চকের ধুলো থেকে বঙ্গভবনের সিঁড়ি: মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ পথচলা
নিজস্ব প্রতিবেদক
একজন রাজনীতিকের দীর্ঘ পথচলাকে কেবল তাঁর পদ-পদবি দিয়ে বোঝা যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে সময়, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দলীয় দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনও তেমন একটি দীর্ঘ যাত্রার উদাহরণ। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে স্থানীয় রাজনীতি, সংসদ, মন্ত্রিসভা ও একটি বড় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব পেরিয়ে তিনি এখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে।
২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ২৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। নির্বাচন কমিশন তাঁকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করে। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর মনোনীত প্রার্থী ছিলেন।
এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। কারণ রাষ্ট্রপতি পদে যাওয়ার অর্থ শুধু একটি নতুন সাংবিধানিক দায়িত্ব গ্রহণ নয়, এর অর্থ সক্রিয় দলীয় রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্বে যাওয়া।
শিক্ষকতা থেকে রাজনীতি
মির্জা ফখরুলের কর্মজীবনের শুরু শিক্ষকতা দিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়াশোনা শেষে তিনি ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা করেন। স্বাধীনতার পরের এই সময়ে তাঁর পেশাগত পরিচয় ছিল একজন শিক্ষক হিসেবে। পরে সরকারি দায়িত্বেও যুক্ত হন। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর তিনি আবার শিক্ষকতায় ফিরে যান। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতি পড়ান। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এর দুই বছর পর, ১৯৮৮ সালে, ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে চেয়ারম্যান হন। অর্থাৎ জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্র থেকে নয়, তাঁর সক্রিয় রাজনৈতিক যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শুরু হয়েছিল স্থানীয় সরকার দিয়ে।
স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয় নেতৃত্ব
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন মির্জা ফখরুল। ১৯৯২ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর ধীরে ধীরে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন। বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব এবং পরে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব—প্রতিটি পদ তাঁর রাজনৈতিক পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে।
২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক জীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। বিএনপি সরকারের সময়ে তিনি কৃষি এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তবে মন্ত্রিত্বের সময়ের চেয়ে পরবর্তী সময় তাঁর জাতীয় রাজনৈতিক পরিচয়কে আরও বেশি দৃশ্যমান করে। এটিই তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব এবং বিশাল পাওনা। ২০০৯ সালে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০১১ সালে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান তিনি। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে তাঁকে মহাসচিব নির্বাচিত করা হয়।
বিএনপির কঠিন সময়ের মুখ
মির্জা ফখরুলের মহাসচিবের সময়কাল ছিল বিএনপির জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্ব। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাস, তারেক রহমানের দেশের বাইরে অবস্থান এবং দলের নেতা-কর্মীদের ওপর মামলা ও গ্রেপ্তারের মতো পরিস্থিতিতে দলীয় রাজনীতিতে তাঁকে নিয়মিতভাবে সামনে থাকতে হয়েছে।
এই সময়েই তিনি গণমাধ্যমে বিএনপির অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। পত্রিকা, টিভি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিএনপি বলতে তাঁর কথায় ছয়লাপ একেবারে। রাজনৈতিক বক্তব্যে তাঁর পরিমিত ভাষা, দীর্ঘ সংবাদ সম্মেলন এবং সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা তাঁকে জাতীয় রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি দেয়। তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকার মূল্যায়ন করতে গেলে তাই শুধু নির্বাচনে জয়-পরাজয় বা মন্ত্রিত্বের হিসাব যথেষ্ট নয়, দীর্ঘ সময় ধরে একটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রকাশ্য নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হয়।
রাজনীতিতে মতপার্থক্য স্বাভাবিক। মির্জা ফখরুলের ক্ষেত্রেও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সমর্থন ও সমালোচনা দুই-ই আছে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে একই দলের শীর্ষ নেতৃত্বে থেকে সংকটের সময়ে দলীয় অবস্থান তুলে ধরার অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
মন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতি
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।
এরপর আসে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার পর তিনি দলের মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন। দলীয় রাজনীতি থেকে সাংবিধানিক দায়িত্বে যাওয়ার এই পরিবর্তনটি তাঁর কয়েক দশকের রাজনৈতিক পথচলায় একটি স্বাভাবিক কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বাঁক।
২০ আগস্টের নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর সেই যাত্রা আরও এক ধাপ এগিয়েছে। এখন তাঁর সামনে রয়েছে দলীয় রাজনীতির বাইরে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন।
একটি রাজনৈতিক বৃত্তের পরিবর্তন
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের দিকে পেছন ফিরে তাকালে একটি ধারাবাহিকতা চোখে পড়ে। শিক্ষকতা থেকে সরকারি দায়িত্ব, সেখান থেকে স্থানীয় সরকার, জাতীয় সংসদ, মন্ত্রিসভা এবং দলীয় নেতৃত্ব। এই পথটি সরল ছিল না। প্রতিটি পর্যায় এসেছে ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায়।
রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর নির্বাচিত হওয়া সেই ধারাবাহিকতারই সর্বশেষ ধাপ। তবে এই পদে এসে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের অর্থও বদলে যাবে। একজন দলীয় মহাসচিব যে রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলতে পারেন, রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সেই পরিসর স্বাভাবিকভাবেই ভিন্ন। ফলে তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দলীয় রাজনীতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের নিরপেক্ষতা ও সাংবিধানিক সীমারেখার সঙ্গে সমন্বয় করা। এই জায়গাটিই তাঁর নতুন অধ্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় কাটানো একজন মানুষ যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যান তখন তাঁর অতীত যেমন আলোচনায় থাকে তেমনি ভবিষ্যৎ ভূমিকার প্রত্যাশাও তৈরি হয়। মির্জা ফখরুলের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না। শিক্ষকতা দিয়ে শুরু হয়েছিল কর্মজীবন। এরপর পৌরসভার চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, মহাসচিব, মন্ত্রী—একের পর এক দায়িত্ব অতিক্রম করে এখন রাষ্ট্রপতি।
এই পথচলাকে এক বাক্যে বলা যায়, “রাজপথ থেকে বঙ্গভবন”। তবে এই যাত্রার মূল্যায়ন শুধু অতীতের পদ-পদবি দিয়ে হবে না। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি কীভাবে সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে নিজের দায়িত্ব পালন করেন, শেষ পর্যন্ত সেটিই তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হয়ে থাকবে।
আমাদের মির্জা স্যার,
very good
❤️❤️❤️❤️❤️