বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট: দায়ের বোঝা কাঁধে নিয়ে এগোচ্ছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
বিদ্যুৎ নেই, গ্যাসের চাপ কম, দিনের ব্যস্ত সময়ে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে, কোথাও গ্যাসের সংকটে রান্না ব্যাহত হচ্ছে, আবার শিল্পকারখানায় উৎপাদন নিয়েও তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা। স্বাভাবিকভাবেই মানুষের প্রশ্ন, ❝এই সংকট কেন?❞
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু আজকের পরিস্থিতির দিকে তাকালে হবে না, তাকাতে হবে গত কয়েক বছরের হিসাবের দিকেও।
একটি রাষ্ট্রের জ্বালানি ব্যবস্থা অনেকটা একটি পরিবারের অর্থনীতির মতো। আগের পরিবার যদি দোকানদারের কাছ থেকে বাকিতে পণ্য নেয়, ব্যাংকের কিস্তি জমিয়ে রাখে এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল পরিশোধ না করে যায়, পরের দিন নতুন পরিবার দায়িত্ব নেওয়ার পরও সেই দেনা অদৃশ্য হয়ে যায় না। বরং নতুন দায়িত্বশীল ব্যক্তিকেই একদিকে সংসারের বর্তমান খরচ চালাতে হয়, অন্যদিকে পুরোনো দেনাও শোধ করতে হয়।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতেও এমন একটি বড় আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছিল। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা দীর্ঘদিন জমেছিল এবং বিদ্যুৎ খাতের বিদেশি দায়ও বড় আকার ধারণ করেছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, আগের সরকারের সময় জমে থাকা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দায় পরবর্তী সরকারকে বহন করতে হয়েছে।
আদানি পাওয়ারের বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ২০২৫ সালের জুনে বাংলাদেশ একবার আদানি পাওয়ারের সব বকেয়া পরিশোধ করে দেয়, এককালীন প্রায় ৪৩৭ মিলিয়ন ডলার পরিশোধের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে আবার বকেয়া জমে এবং ২০২৬ সালে সরবরাহ কমানো বা বন্ধ করার হুমকির মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়।
অর্থাৎ সংকটকে এক লাইনে ‘বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা’ বলে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। বর্তমান সরকারকে একই সঙ্গে দুই ধরনের চাপ সামলাতে হচ্ছে—একদিকে দেশের মানুষের বর্তমান বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চাহিদা মেটানো, অন্যদিকে অতীতের আর্থিক দায় ও বকেয়া পরিশোধ করা।
প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার কি বসে আছে?
উত্তর—না।
সরকার বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছে, জ্বালানি আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করছে এবং সংকট সাময়িকভাবে সামাল দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথও খুঁজছে। বিদ্যুৎ খাতে বড় অঙ্কের বকেয়া পরিশোধের উদ্যোগের খবরও এসেছে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু পুরোনো পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে বিকল্প জ্বালানির দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে।
সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ তারই একটি উদাহরণ। ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সরকার ব্যাটারি-সংযুক্ত রুফটপ সোলার ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দিলে প্রতি ইউনিট ১০.৫০ টাকা হারে পাওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।
এটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বিকল্প নয়; ভবিষ্যতে আমদানি-নির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমানোর একটি কৌশলও হতে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, কয়লা ও এলএনজির দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি অস্থির হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির ওপর। বিশেষজ্ঞরাও সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি স্টোরেজকে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সম্ভাব্য পথ হিসেবে দেখছেন।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার—বকেয়া পরিশোধ করলেই রাতারাতি পুরো বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট শেষ হয়ে যাবে, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। সংকটের পেছনে সরবরাহ, জ্বালানি আমদানি, বৈশ্বিক বাজার, গ্যাসের প্রাপ্যতা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র গুলোর জ্বালানি সরবরাহ, সবকিছুই কাজ করে।
তবু আশার জায়গা আছে। সরকার যদি দ্রুত বকেয়া পরিশোধের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে, প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে এবং একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য দেশীয় জ্বালানি উৎসের সক্ষমতা বাড়াতে পারে, তাহলে বর্তমান চাপ ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব।
আজকের অন্ধকারকে শুধু আজকের সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে সমস্যার ইতিহাস আড়াল হয়ে যায়। আবার অতীতের দায়ের কথা বলে বর্তমানের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়াও সমাধান নয়। দায় এসেছে অতীত থেকে, কিন্তু সমাধানের দায়িত্ব বর্তমানের।
এই সরকার সেই দায়ের একটি বড় অংশ কাঁধে নিয়েই এগোচ্ছে। মানুষের স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক বাকযুদ্ধ নয়, প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত, বকেয়া পরিশোধ, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই জ্বালানি নীতি। আজকের সংকট যদি সঠিকভাবে মোকাবিলা করা যায়, তাহলে এই কঠিন সময়ই বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও স্বনির্ভর করার একটি সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
❤️❤️❤️❤️❤️❤️
❤️❤️❤️