
নিজস্ব প্রতিবেদক-
শুক্রবার ০৬-নভেম্বর-২০২৬ইং
যুগে যুগে বাংলাদেশ ও বিশ্ব ইতিহাসে কিছু মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁদের জীবন দর্শন ও অবদান জাতির জন্য সদাসর্বদা অপরিহার্য ও পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে। যাহারা ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান, ও জুলাই বিপ্লবসহ আন্দোলন সংগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।
এই মহান চরিত্র গুলোর মধ্যে উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম “শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান”, যিনি সেনা ব্যারাক থেকে উঠে এসে জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। রাষ্ট্রের জন্য আত্মত্যাগ করেছেন এবং গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার মশাল জ্বালিয়েছেন।
জীবনের বাঁকে বাঁকে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্ব, রাজনীতিতে সাহসিকতা এবং রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দূরদর্শিতা এই জাতির ইতিহাসে স্থায়ীভাবে আলপনা এঁকে ফেলেছে।
সেনাবাহিনীর গুণগত কাঠামো ও শৃঙ্খলার ফিরিয়ে আনা, দেশপ্রেমে উদ্ভুদ্ধ করা জিয়াউর রহমান মানবিকতা ও বীরত্বের প্রমাণ বহন করে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দেশে বিদ্যমান নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি আরো ঘণীভূত হয়। সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ভেঙে দেয়। কিন্তু সেই অন্ধকারে আলোর ঝলকানি নিয়ে আসে ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর ১৯৭৫। এই দিনে সিপাহী-জনতার বিপ্লব শুধু একটি সামরিক আন্দোলন ছিল না বরং এটি ছিল জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রাম।
জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী চিন্তা ভাবনা, অসামান্য নেতৃত্বগুণ ও দেশপ্রেমের কারণে তাহার প্রতি জনসাধারণের ভালোবাসা ও সৈনিকদের পূর্ণ আস্থা তৈরি হয়। এবং তাঁহাকে পরিণত করে এক জনপ্রিয় জাতীয় নেতায়। এই বিপ্লব ছিল— নতুন এক সূচনা, যা সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশে গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো গঠনের ভিত্তি স্থাপন করে। জনগণের স্বপ্ন, আশা ভরসা এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তাঁর নেতৃত্বে সঙ্গতিপূর্ণ রুপ লাভ করে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই সিপাহি জনতার সামগ্রিক প্রচেষ্টায় কুচক্রী খালেদ মোশাররফের পরাজয় ঘটে, স্বাধীকার অর্জনের পথ প্রসস্থ হয়।
এই ঐতিহাসিক দিনে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এক যুগান্তকারী রাজনৈতিক পথচলার সূচনা করেন, যা ভবিষ্যতের বাংলাদেশের চেহারা পাল্টে দেয়। বিপ্লব পরবর্তী ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া বাংলাদেশকে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ থেকে সরিয়ে এনে, গণতন্ত্রকামী একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় তাহার দূরদর্শী পদক্ষেপে।
ইতিহাস স্বাক্ষী যখনই জাতি কঠিন ক্রান্তিলগ্নে নিপতিত হয়েছে তখনই জাতির মুক্তির লক্ষ্যে ত্রাতা হয়ে এসেছে জিয়া পরিবার। আবার জিয়া পরিবারের সাময়িক সমস্যাতেও সমগ্র দেশ একত্রিত হয়ে দাঁড়িয়েছে জিয়া পরিবারের পাশে।
বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় হলো— ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। সেই সময়ে মেজর জিয়াউর রহমান দেশের ভয়াবহ সংকটে মহান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তাঁর ঘোষণা, তাঁর কণ্ঠস্বর বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, একটি নিপীড়িত জাতিকে মুক্ত করতে হলে কেবল স্বপ্ন নয় বরং অসমসাহসিকতা ও যথাযথ দিক-নির্দেশনা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সেই ঘোষণাই ভবিষ্যৎ স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন করে। পরবর্তী নয় মাস রক্তক্ষয়ী সম্মুখ সমরে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কঠিন সমরে অবতীর্ণ হন।
তাঁর নেতৃত্বের গুণাবলি কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না বরং আন্তর্জাতিক মঞ্চেও তিনি বাংলাদেশের ন্যায্যতা ও মুক্তিযুদ্ধের নৈতিক ভিত্তিকে উপস্থাপন করেন। তাঁর চেতনা ও আদর্শ লক্ষ লক্ষ মানুষকে উজ্জীবিত করে।
১৯৭০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে বিপ্লব পরবর্তী সময়ে সমাজতন্ত্রের কালোছায়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে বিশ্বের প্রভাবশালী অনেক দেশ। বাংলাদেশ নামক সদ্য জন্মলাভ করা দেশটিতেও নেমে আসে সেই কালোছায়া। একটি দলের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে, বাংলাদেশকে বাকশালের মতো একটি ঘৃণ্য শাসনব্যবস্থায় শৃংখলিত করা হয়।
একদিকে বাকশালীদের সীমাহীন দূর্নীতি অনিয়ম ও বৈষম্য সৃষ্টর ফলে সারাদেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের ক্ষত তৈরি হয় ও উত্তারাঞ্চলে তীব্রতর মঙ্গায় বিপর্যস্ত হয়। অন্যদিকে আধিপত্যবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। প্রতিবেশীরা লিপ্ত হয় বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিনত করার গভীর ষড়যন্ত্রে। ১৫ আগষ্ট ৭৫ সালে দেশের প্রেসিডেন্ট হত্যাকান্ডের শিকার হলে সমগ্র জাতি গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে।
খন্দকার মোশতাক ক্ষমতা দখল করলেও ফ্যাসিবাদী আচরণ পরিহার করতে ব্যর্থ হয়।
সামরিক শাসন দেশের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো ভেঙে চুরমার করে দেয়।
পরবর্তীতে খন্দকার মোশতাক সরকারের পতন ঘটিয়ে আরও জঘন্য খালেদ মোশাররফ ক্ষমতার মসনদে বসে। কেন্দ্রবিন্দুতে বসেই খালেদ মোশাররফ নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ভিনদেশি প্রভুদের স্বার্থরক্ষায় অতিমাত্রায় তৎপর হয়ে উঠেন। একটি স্বাধীন দেশের সূর্য মাত্র চার বছরের মাথায় আবারও অস্তমিত হওয়ার উপক্রম হয়।
দেশের এহেন মুমূর্ষু পরিস্থিতিতে আবারও দৃশ্যপটে আসেন স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও আপামর জনসাধারণের আস্থার প্রতীক জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনি দৃঢ়চিত্তে দেশ বিরোধী সকল প্রকার আগ্রাসন রুখে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এমতাবস্থায় জিয়াউর রহমান আরও একবার ভিনদেশী ও দেশের স্বাধীনতা বিরোধী কুচক্রী মহল ও সংস্থা গুলোর চক্ষুশূলে পরিনত হয়। সারাদেশের বিরাজমান অস্থিরতায় ঘৃণ্য অপকৌশল প্রয়োগ করে একদল বিপথগামী সেনাসদস্য জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করে ফেলে।খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে দেশের আপামর জনসাধারণের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ন্যায় তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার ঘটে।
স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রতীক সেনাবাহিনীর সদস্যরা সর্বজন শ্রদ্ধেয় সেনা অফিসার জিয়াউর রহমানের দ্রুত মুক্তির লক্ষ্যে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ব্যারাকে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এবং সেই সেনা বিদ্রোহে সর্বাত্মক সমর্থন জানিয়ে দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা সারাদেশে রাস্তায় নেমে আসে। শুরু হয় বিপ্লবী জনতার তীব্র আন্দোলন সংগ্রাম।
আন্দোলনের তীব্রতায় সিপাহি জনতা তৎকালীন কুখ্যাত খালেদ মোশাররফকে হত্যার মাধ্যমে নতজানু সরকারের পতন ঘটিয়ে, জিয়াউর রহমানেকে মৃত্যুর মুখ থেকে মুক্ত করার পরে,
তাহার হাতে দেশের শাসনভার তুলে দেওয়া হয়।
ব্যর্থ হয় স্বাধীনতা বিরোধী ও আধিপত্যবাদী দেশ গুলোর অপকৌশল।
মুক্ত হয় জিয়াউর রহমান, মুক্ত হয় দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ও লাল সবুজের মানচিত্র।
এহেন পটভূমিতে ৭ নভেম্বরের পর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশকে একটি নতুন দিক নির্দেশনা দেন। তিনি দেশীয় বাস্তবতা ও বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপট উপলব্ধি করে, গণতান্ত্রিক ধারা ও মুক্ত বাজারনীতি ও টেকসই উন্নয়নের পথে হাঁটতে থাকেন।
ধাপে ধাপে রাজনৈতিক দল গঠনের সুযোগ সৃষ্টি, গণতন্ত্রের বহুদলের পথ উন্মুক্ত করে।জাতীয়তাবাদের ধারণাটি কার্যকর প্রতিষ্ঠা লাভ করে; যার মূল ভিত্তি ছিল— স্বাধীন, সার্বভৌম ও ধর্মীয় মূল্যবোধ-সমন্বিত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মনে করতেন— একটি উন্নত জাতি গঠনের জন্য বহুদলীয় গণতন্ত্র অপরিহার্য। সেই চিন্তা থেকেই ১৯৭৮ সাল থেকে তিনি দেশে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। একদলীয় শাসনের পরিবর্তে তিনি রাজনৈতিক মতের বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেন এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিমণ্ডল গড়ে তোলার পথ তৈরি করেন। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যমের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলমান নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হয়।
এছাড়াও দেশের বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক সংলাপ চালু এবং গণতন্ত্রের শিকড় মজবুত বাকশালের সময় নিষিদ্ধ হওয়া সকল রাজনৈতিক দলকে মুক্ত রাজনীতি করার পরিবেশ তৈরিতে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
জনকল্যাণমুখী চিন্তা ভাবনা ও স্বীয় দর্শন বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রপ্রধান জিয়াউর রহমান একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন যা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি নামে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই দলটি গঠিত হয়েছিল— “জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস” এই মূলনীতি ও “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ” এই আদর্শকে ভিত্তি করে। দলের দর্শন ছিল— জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে জনগণের অংশগ্রহণে একটি গণমুখী এবং ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্র গঠন করা।
এভাবে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হয়, যা শুধু দেশের জন্য নয় বরং দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটেও একটি ব্যতিক্রমধর্মী দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।
রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানের জীবনের শেষ অধ্যায়েও জনগণের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অটুট। তাঁর মৃত্যুর পর লাখো মানুষের অশ্রু বিসর্জন আর শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং জানাজায় ইতিহাসের সর্বোচ্চ মুসল্লীর উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন— জাতির আশা, ভরসা ও আস্থার প্রতীক।
শৈশব কৈশোর পেরিয়ে একজন সেনা কর্মকর্তার জীবন থেকে শুরু, মহান স্বাধীনতার ঘোষণা, রণাঙ্গনে বীরত্বের কীর্তি অর্জন, সিপাহি জনতার বিপ্লবে রাষ্ট্রনায়ক হওয়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠন এবং দেশ ও জনতার কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করে,একটি দুর্লভ যাত্রায় জাতির হৃদয়ে স্থান পাওয়া অবিস্মরণীয় নাম হচ্ছে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।
যেই নাম সৃষ্টির শেষাবধি পর্যন্ত আপামর জনসাধারণের হৃদয়ে লিপিবদ্ধ থাকবে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়।