মায়ের শেষ আকুতি—১৪০ দিন পর স্বদেশে ফিরলেন হাসমত

নিজস্ব প্রতিবেদক
কবরের মাটির নিচে তখন নিথর পড়ে আছেন একজন মানুষ। কিন্তু দূর আফগানিস্তানে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন একজন মা—অসুস্থ, বয়সের ভারে নুয়ে পড়া, অথচ বুকের ভেতর একটাই আকুতি “আমার ছেলেকে শেষবারের মতো নিজের মাটিতে ফিরিয়ে দাও।” সেই আকুতিই শেষ পর্যন্ত পেরেছে দীর্ঘ ১৪০ দিনের অপেক্ষা।
আফগানিস্তানের নাগরিক হাসমত মোহাম্মদী। গত ১৩ এপ্রিল ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার পলিয়ানপুর সীমান্তসংলগ্ন ইছামতী নদী থেকে তাঁর ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করেছিল পুলিশ ও বিজিবি। পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় ১৪ এপ্রিল তাঁকে বেওয়ারিশ হিসেবে ঝিনাইদহ পৌর কেন্দ্রীয় গোরস্থানে দাফন করা হয়।
কিন্তু গল্প সেখানেই শেষ হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত মরদেহের ছবি দেখে আফগানিস্তানে থাকা পরিবার তাঁকে শনাক্ত করে। এরপর শুরু হয় আরেক দীর্ঘ অপেক্ষা, নিজের ভাইয়ের মরদেহটি অন্তত একবার নিজের দেশের মাটিতে ফিরিয়ে নেওয়ার অপেক্ষা।
ছোট ভাই ইমাল মোহাম্মদী বাংলাদেশে আসেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, অনুমোদন ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তাঁকে প্রায় ৫৮ দিন বাংলাদেশে অবস্থান করতে হয়। প্রতিটি দিন হয়তো তাঁর কাছে ছিল একেকটি দীর্ঘ অপেক্ষা। অবশেষে আসে সেই দিন।
১ সেপ্টেম্বর জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের উপস্থিতিতে ঝিনাইদহ পৌর কেন্দ্রীয় গোরস্থান থেকে ১৪০ দিন পর হাসমতের মরদেহ উত্তোলন করা হয়। প্রয়োজনীয় আইনি ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শেষে মরদেহটি তাঁর ছোট ভাই ইমালের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ভাইয়ের নিথর দেহ হাতে পেয়ে ইমাল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
তাঁর কণ্ঠে তখন কোনো অভিযোগ ছিল না। ছিল শুধু কৃতজ্ঞতা, বাংলাদেশ সরকার, ঝিনাইদহের প্রশাসন, পুলিশ এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রতি।
কারণ, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে আসা একজন ভাই অবশেষে তাঁর ভাইকে নিয়ে ফিরতে পারছেন। আর দূর আফগানিস্তানে একজন অসুস্থ মা হয়তো এখন তাঁর সন্তানের শেষ ঠিকানাটুকু নিজের দেশের মাটিতে দেখতে পাবেন।
মৃত্যুর পরও একজন সন্তানের জন্য মায়ের অপেক্ষা শেষ হয়নি। আর সেই অপেক্ষার শেষ প্রান্তে ছিল, স্বদেশের মাটি।
বাংলাদেশের মাটিতে ১৪০ দিনের শেষ অধ্যায় পেরিয়ে হাসমত আজ ফিরছেন তাঁর নিজের দেশে।
একটি মরদেহের প্রত্যাবর্তন, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একজন মায়ের কান্না, একজন ভাইয়ের অপেক্ষা এবং মানবিকতার এক অসাধারণ গল্প।