বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, আদর্শের শেকড় ও আমাদের রাজনৈতিক বাতিঘর

পর্ব–০৩: মরহুম নূর হোসেন হুমায়ুন মিঞার সংগ্রামী জীবন ও স্মৃতিরেখা

বি এম সায়দুল হক
দাগন ভূঁইয়া প্রতিনিধি

বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ইতিহাস কেবল মিছিল-মিটিং, স্লোগান কিংবা রাজনৈতিক পদ-পদবির ইতিহাস নয়। এই ইতিহাসের নেপথ্যে রয়েছে অসংখ্য মানুষের ত্যাগ, নির্যাতন, কারাবরণ এবং নিঃস্বার্থ রাজনৈতিক সংগ্রাম। নব্বইয়ের দশকে প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও যারা রাজপথে থেকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ভিত্তিকে তৃণমূল পর্যায়ে ধরে রেখেছিলেন, তাদের অনেকেই আজ বিস্মৃতির আড়ালে।

অথচ তাদের জীবন ও সংগ্রামের গল্প নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। কারণ একটি রাজনৈতিক আদর্শের শেকড় কতটা গভীরে বিস্তৃত ছিল, তা বুঝতে হলে সেই সময়ের ত্যাগী মানুষগুলোর জীবনকথা জানা দরকার।

সেই ধারাবাহিক স্মৃতিচারণের তৃতীয় পর্বে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি নব্বইয়ের দশকের রাজপথের এক অদম্য, ত্যাগী ও রাজবন্দী নেতা মরহুম নূর হোসেন হুমায়ুন মিঞা মামাকে

জন্ম ও ঐতিহ্যবাহী মিঞা পরিবারের শেকড়

মরহুম নূর হোসেন হুমায়ুন মিঞা জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬৯ সালের ১ ডিসেম্বর। ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলার ১ নম্বর সিন্দুরপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সুজাতপুর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী দরবেশের হাটকেন্দ্রিক মিঞা বাড়িতে তার জন্ম। তার পিতা ছিলেন মরহুম তফাজ্জল হোসেন মিঞা।

সুজাতপুরের ঐতিহ্যবাহী ‘মিঞা বাড়ি’ স্থানীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত একটি নাম। একসময়ের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সিরাজ চেয়ারম্যানের মৃত্যুর পর এই পরিবার থেকে সরাসরি রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা আগের মতো দৃশ্যমান না হলেও, সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চর্চার কারণে মিঞা বাড়ির একটি আলাদা পরিচিতি ছিল।

এই পরিবারের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডল সম্পর্কে হুমায়ুন মামার কাছ থেকেই বিভিন্ন সময়ে অনেক কথা শুনেছি। এলাকার প্রবীণদের কাছ থেকেও জানা যায়, ফেনী জেলা জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর মকবুল আহমদ সাহেবের সঙ্গে মিঞা পরিবারের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্কের সূত্রে এই ঐতিহ্যবাহী বাড়িতে তার নিয়মিত যাতায়াত ও অবস্থানের কথাও স্থানীয়ভাবে স্মরণ করা হয়।

নব্বইয়ের দশকের উত্তাল রাজপথে হুমায়ুন মিঞা

নব্বইয়ের দশকে যারা রাজপথে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, তাদের কাছে নূর হোসেন হুমায়ুন মিঞা ছিলেন পরিচিত একটি সংগ্রামী নাম।

দরবেশের হাটকেন্দ্রিক মিঞা বাড়ির সামাজিক ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত থাকার কারণে জীবনের বিভিন্ন সময়ে তাকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয় বলে তার স্বজন ও পরিচিতজনদের বর্ণনায় উঠে আসে।

রাজনৈতিক হয়রানি, জুলুম ও নির্যাতনের নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও তিনি তার রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে সরে যাননি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রতি তার যে আস্থা ছিল, কঠিন সময়ও তাকে সেই পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।

দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও কারাজীবনের প্রভাব তার শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও পড়ে। শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন

কারাজীবনের স্মৃতি ও ফেনীর রাজনৈতিক বাস্তবতা

তৎকালীন জাতীয় পার্টির শাসনামলে ফেনীর সংসদ সদস্য ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা জাফর ইমাম। ওই সময় ফেনীর রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত ছিল ‘টাইগার বাহিনী’, যার প্রধান হিসেবে শাহীন বা ‘টাইগার শাহীন’ পরিচিত ছিলেন।

তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন সময়ের কারাবরণের সূত্রে হুমায়ুন মিঞার সঙ্গে শাহীনের জেলে পরিচয় হয় এবং একাধিকবার একই সময়ে বন্দিজীবন কাটানোর ঘটনাও তার রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতির অংশ হয়ে আছে।

পরবর্তী সময়ে ফেনী বিসিক শিল্প এলাকায় তাদের পরিচিতি ও সুসম্পর্ক বজায় ছিল।

আমার জীবনে হুমায়ুন মামা: একজন অভিভাবকের স্মৃতি

হুমায়ুন মামার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূচনা ১৯৯৯ সালে। ২০০০ সালের দিকে ফেনী বিসিক শিল্প এলাকায় আমাদের দোকানে তার সঙ্গে আমার দেখা হয়।

সেদিন আমাকে দেখতে পেয়ে তিনি অত্যন্ত স্নেহভরে কাছে ডেকে নেন। সেখানে উপস্থিত শাহীন সাহেবের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বলেছিলেন—

“বিএম সাইদুল হক আমার ভাগিনা। ওরা দীর্ঘদিন ধরে এখানে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করছে। ও যেন এখানে শান্তিতে ব্যবসা করতে পারে এবং কোনো সমস্যা না হয়, তোমরা সেটা খেয়াল রাখবে।”

তার সেই কথার মধ্যে ছিল একজন অভিভাবকের মমতা ও আপন করে নেওয়ার আন্তরিকতা।

এরপর থেকে তিনি যখনই ফেনী বিসিক শিল্প এলাকায় আসতেন, আমাকে দেখতে আসতেন। আমার এবং আমার পরম শ্রদ্ধেয় আব্বুর সঙ্গে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে কুশল বিনিময় করতেন। পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয় নিয়েও খোঁজখবর নিতেন।

পরবর্তী সময়ে তার ছোট ভাই সুমন ব্যবসায়িক কিংবা ব্যক্তিগত কাজে চট্টগ্রামে এলে তার সঙ্গে আমার নিয়মিত দেখা হতো। সুমনের মাধ্যমেই হুমায়ুন মামার শারীরিক অবস্থা ও রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন খবরাখবর রাখতাম।

তার সঙ্গে গড়ে ওঠা এই আত্মিক সম্পর্ক এবং একজন অভিভাবকের মতো তার স্নেহ আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন।

শালিস-বিচারে ন্যায়পরায়ণতা ছিল তার অন্যতম পরিচয়

রাজনীতির বাইরে সামাজিক মানুষ হিসেবেও নূর হোসেন হুমায়ুন মিঞার আলাদা একটি গ্রহণযোগ্যতা ছিল।

তার অন্যতম উল্লেখযোগ্য গুণ ছিল সামাজিক বিচার-শালিসে নিরপেক্ষতা। কোনো সামাজিক বিরোধ দেখা দিলে তিনি উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেওয়ার চেষ্টা করতেন।

বাদী কিংবা বিবাদী—কে কোন পক্ষের, তার চেয়ে কোনটি সত্য এবং কোনটি ন্যায়—সেটিই ছিল তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত প্রভাব, পরিচয় কিংবা চাপের কাছে নতিস্বীকার না করে ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য তিনি মানুষের আস্থা অর্জন করেছিলেন।

তার সময়ের রাজনীতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা। রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। হুমায়ুন মিঞার জীবনেও সেই সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন দেখা যায়।

নতুন প্রজন্মের জন্য যে বার্তা রেখে গেলেন

সময়ের সঙ্গে রাজনীতির ধরন বদলেছে। বদলেছে যোগাযোগের মাধ্যম, রাজনৈতিক প্রচারের ভাষা এবং নেতৃত্বের প্রকাশভঙ্গি। কিন্তু আদর্শ, ত্যাগ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার মূল্য কখনো পুরোনো হয় না।

মরহুম নূর হোসেন হুমায়ুন মিঞার জীবন নতুন প্রজন্মের সামনে সেই কথাটিই মনে করিয়ে দেয়—রাজনীতি শুধু পদ-পদবি অর্জনের বিষয় নয়; রাজনীতি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর, প্রতিকূলতার মধ্যে আদর্শ ধরে রাখার এবং প্রয়োজনে ত্যাগ স্বীকার করারও নাম।

নব্বইয়ের দশকের রাজপথের যেসব ত্যাগী নেতাকর্মী কঠিন সময়ে রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে ছিলেন, তাদের জীবন ও অবদান ইতিহাসের অংশ। তাদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

মরহুম নূর হোসেন হুমায়ুন মিঞা আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার রাজনৈতিক সংগ্রাম, সামাজিক ভূমিকা এবং মানুষের প্রতি আন্তরিকতার স্মৃতি এখনও যারা তাকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাদের হৃদয়ে বেঁচে আছে।

গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি এই ত্যাগী মানুষটিকে।

মহান আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন, তার কবরকে নূরে পরিপূর্ণ করুন এবং তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।


বি এম সায়দুল হক
দাগন ভূঁইয়া প্রতিনিধি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *