চাঁদপুরের পাটোয়ারী বাজারে জমি-ভবনের বায়না নিয়ে বিরোধ চরমে, হামলার অভিযোগ
চাঁদপুর প্রতিনিধি: চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার ২ নম্বর বালিথুবা ইউনিয়নের পাটোয়ারী বাজারে জমি ও ভবন কেনাবেচার বায়না চুক্তিকে কেন্দ্র করে বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করে বুঝিয়ে না দেওয়া, বায়নার টাকা ফেরত না পাওয়া এবং পরবর্তী সময়ে হামলার অভিযোগ তুলেছেন ক্রেতা শরিফুল ইসলাম। এ ঘটনায় এলাকায় আলোচনা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
বায়না চুক্তি ও সম্পত্তি হস্তান্তর নিয়ে বিরোধ
অভিযোগকারী শরিফুল ইসলামের দাবি, পাটোয়ারী বাজারে অবস্থিত একটি জমি ও ভবন বিক্রির জন্য মালিক মিজানুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে ক্রেতা খুঁজছিলেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে শরিফুল ইসলাম সম্পত্তিটি কেনার বিষয়ে সম্মত হন। তবে সম্পত্তিটি ব্যাংকের কাছে বন্ধক থাকায় ব্যাংকঋণসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের বিষয়টি সামনে আসে।
ক্রেতাপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংক কর্মকর্তার পরামর্শে উভয় পক্ষ সাক্ষীদের উপস্থিতিতে ব্যাংক ম্যানেজারের সামনে বায়না চুক্তি সম্পাদন করেন। তখন বিক্রেতা এক সপ্তাহের মধ্যে সম্পত্তি বুঝিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন। নির্ধারিত বিক্রয়মূল্যের একটি অংশ বায়না হিসেবে গ্রহণ করা হয় এবং বাকি টাকা সম্পত্তি হস্তান্তরের সময় পরিশোধের কথা ছিল বলে দাবি করেন শরিফুল ইসলাম।
বারবার সময় দিয়েও সম্পত্তি বুঝে না পাওয়ার অভিযোগ
শরিফুল ইসলামের অভিযোগ, এক সপ্তাহ পর যোগাযোগ করা হলে মিজানুর রহমান ব্যাংকঋণের ১০ লাখ টাকা মওকুফের আবেদনের কথা জানিয়ে আরও ১৫ দিন সময় চান। মানবিক বিবেচনায় তাঁকে সময় দেওয়া হয়। কিন্তু এরপরও কয়েক মাস অতিবাহিত হলেও সম্পত্তির রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়নি।
ক্রেতাপক্ষের দাবি, পরবর্তী সময়ে বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় তাঁরা বিক্রেতার পরিবারের সদস্য ও বায়না চুক্তির সময় উপস্থিত সাক্ষীদের বিষয়টি জানান। তাঁদের উদ্যোগে সালিশ বৈঠকের তারিখ নির্ধারণ করা হলেও বিক্রেতা বৈঠকে উপস্থিত হননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
১০ জুলাইয়ের বৈঠকেও সমাধান হয়নি বলে দাবি
অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েক মাস পর মিজানুর রহমান নিজেই শরিফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। এর ধারাবাহিকতায় ১০ জুলাই ২০২৬ তারিখে পাটোয়ারী বাজার কমিটির সভাপতিকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় শরিফুল ইসলামের সঙ্গে একটি বৈঠকে অংশ নেন তিনি।
ক্রেতাপক্ষের দাবি, ওই বৈঠকে মিজানুর রহমান আগস্ট মাসের ৩ বা ৪ তারিখের মধ্যে সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করে বুঝিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে নির্ধারিত সময়ের পর যোগাযোগ করা হলে বিক্রেতা সম্পত্তি হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানান এবং হুমকি দেন বলে অভিযোগ করেছেন শরিফুল ইসলাম।
ব্যাংকে অর্থ আটকে থাকায় আর্থিক ক্ষতির দাবি
শরিফুল ইসলামের ভাষ্য, সম্পত্তিটি ব্যাংকের কাছে বন্ধক থাকায় ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ব্যাংকঋণসংক্রান্ত অর্থের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে অর্থ আটকে থাকায় তিনি উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে দাবি করেন।
এ পরিস্থিতিতে তিনি চাঁদপুরের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের মাধ্যমে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে অভিযোগ দায়ের করেন বলে জানান। তাঁর দাবি, অভিযোগের পর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
১২ অক্টোবর হামলার অভিযোগ
শরিফুল ইসলামের অভিযোগ, গত ১২ অক্টোবর সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের বিষয়ে তাঁর বাড়ির পাশের কয়েকজন ব্যক্তি মিজানুর রহমানের ছেলের দোকানে কেনাকাটা করতে গিয়ে কথার প্রসঙ্গে বিষয়টি জানতে চান। এ সময় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
পরে বিষয়টি জানতে পেরে শরিফুল ইসলাম সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে মিজানুর রহমানের ছেলে তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং কয়েকজনকে ডেকে এনে তাঁর ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয় বলেও দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগে হামলায় মোস্তফা, হাবিব, বাহার, মোরশেদসহ আরও কয়েকজনের জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করেছেন ক্রেতাপক্ষ। তাঁদের আরও দাবি, ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য এবং ঘটনার স্বাধীন যাচাই এখনো পাওয়া যায়নি।
বিক্রেতার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও অভিযোগ
ক্রেতাপক্ষের অভিযোগ, মিজানুর রহমান অতীতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী ছিলেন এবং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন। রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি অতীতেও একই ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য বা সংশ্লিষ্ট অন্য ভুক্তভোগীদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সুষ্ঠু তদন্ত ও সমাধানের দাবি
ভুক্তভোগী শরিফুল ইসলাম সম্পত্তির বায়না চুক্তি, অর্থের লেনদেন এবং হামলার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত চান। পাশাপাশি চুক্তি অনুযায়ী সম্পত্তির রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা অথবা আইনানুগভাবে তাঁর পাওনা অর্থের বিষয়ে সমাধানের দাবি জানিয়েছেন বলে তাঁর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত মিজানুর রহমান, তাঁর ছেলে এবং সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, ব্যাংকের বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
সূত্র: অভিযোগকারী ও তাঁর পক্ষের দেওয়া তথ্য
ডেইলি জনতার কণ্ঠ
ওয়েবসাইট: dailyjanatarkontho.com