
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ-
রাজধানী ঢাকার অলিগলি, ফুটপাত, গ্যারেজ ও আবাসিক এলাকার বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অসংখ্য চার্জিং পয়েন্ট। এসবের বড় একটি অংশ চলছে অনুমোদন ছাড়াই। কোথাও বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে সরাসরি সংযোগ, কোথাও মিটার বাইপাস করে আবার কোথাও বৈধ সংযোগের আড়ালে অতিরিক্ত চার্জিং ব্যবসা চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকায় এমন অবৈধ বা অনানুষ্ঠানিক চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা ৪৮ হাজারের বেশি বলে সরকারি তথ্য ও বিভিন্ন সংস্থার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। জাতীয় সংসদে ৭ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, শুধু রাজধানীতেই প্রায় ৪৮ হাজার অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে। অন্যদিকে বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা মাত্র প্রায় ৩ হাজার ৩০০।
বৈধের চেয়ে অবৈধ পয়েন্ট কয়েকগুণ
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে রাজধানীর আটটি অপরাধ বিভাগে ৪৮ হাজার ১৩৬টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট এবং ৯৯২টি গ্যারেজের তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে বৈধ চার্জিং স্টেশনের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৩০০।
অর্থাৎ, অনুমোদিত চার্জিং স্টেশনের তুলনায় অননুমোদিত পয়েন্টের সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। মিরপুর, ওয়ারী, গুলশান, উত্তরা, মতিঝিলসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এসব পয়েন্টের অস্তিত্বের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
খুঁটি থেকে হুকিং, তারপর সরাসরি ব্যাটারিতে
অনুসন্ধানে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কিছু এলাকায় বৈদ্যুতিক খুঁটি কিংবা স্ট্রিটলাইটের লাইন থেকে অবৈধভাবে তার টেনে চার্জিংয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কোথাও আবার গ্যারেজের বৈধ মিটারের পাশাপাশি আলাদা অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে ডিএমপি ও ডিপিডিসির যৌথ অভিযানে এমন কয়েকটি অবৈধ অটোরিকশা চার্জিং পয়েন্টের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
বছরে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি
অবৈধ সংযোগে অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার ফলে শুধু বিদ্যুৎ চুরিই নয়, সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে অটোরিকশা চার্জিংয়ে সরকার বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।
এ ক্ষতির পাশাপাশি অবৈধ সংযোগের কারণে বিতরণব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বৈধ চার্জিং স্টেশন মাত্র ৩ হাজার ৩০০
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য অনুমোদিত চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। এর বিপরীতে শুধু ঢাকাতেই অবৈধ বা অনানুষ্ঠানিক পয়েন্টের সংখ্যা প্রায় ৪৮ হাজার।
প্রশ্ন উঠছে—মাত্র কয়েক হাজার অনুমোদিত স্টেশনের বিপরীতে কীভাবে কয়েক দশ হাজার অননুমোদিত চার্জিং পয়েন্ট গড়ে উঠল?
নজরদারির ঘাটতি, নাকি স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়া?
অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট বন্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালিত হলেও অভিযান শেষ হওয়ার পর অনেক জায়গায় আবার একই কার্যক্রম শুরু হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে কিছু গ্যারেজে বৈধ মিটারের পাশাপাশি অবৈধ সংযোগ ব্যবহারের অভিযোগও উঠে এসেছে। ফলে শুধু সংযোগ বিচ্ছিন্ন করাই নয়, এসব পয়েন্ট কীভাবে তৈরি হচ্ছে, কারা জায়গা দিচ্ছে এবং বিদ্যুৎ চুরির সঙ্গে কোনো অসাধু চক্র জড়িত কি না—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সমস্যার আরেক দিক—অটোরিকশার লাগামহীন বিস্তার
অবৈধ চার্জিংয়ের সঙ্গে রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দ্রুত বিস্তারের সম্পর্ক রয়েছে। সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার রয়েছে এবং এসব যান মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সরকার এখন এসব যান পুরোপুরি বন্ধ না করে ডিজিটাল নিবন্ধন, কিউআর কোড ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে।
করণীয় কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি—
সব চার্জিং পয়েন্টের ডিজিটাল নিবন্ধন করতে হবে।
অনুমোদনহীন চার্জিং পয়েন্ট দ্রুত শনাক্ত করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে।
বৈধ চার্জিং স্টেশনগুলোতে স্মার্ট মিটার ও পৃথক নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
বিদ্যুৎ চুরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও চক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে।
বৈধ ও অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের তথ্য প্রকাশ্যে এনে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
অটোরিকশার সংখ্যা, রুট ও চার্জিং ব্যবস্থা সমন্বয় করে একটি কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে।