নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
ডাকসু নির্বাচনের সময় ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে সংগঠনটি কোনো রাজনৈতিক দলের ‘লেজুড়বৃত্তিক সংগঠন নয়’—এমন বক্তব্য সামনে এসেছিল। তাদের বক্তব্যের মূল দাবি ছিল, অন্যান্য ছাত্রসংগঠন যেখানে নিজ নিজ ‘মাদার পার্টির’ রাজনৈতিক স্বার্থে কাজ করে, শিবির সে ধরনের সাংগঠনিক সম্পর্কের মধ্যে নেই।
তবে ডাকসু নির্বাচন-পরবর্তী কিছু ঘটনা ঘিরে সেই দাবির রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে শিবির-সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী মো. আবু সাদিক কায়েম ভিপি নির্বাচিত হন। একই প্যানেল থেকে জিএস ও এজিএস পদেও প্রার্থীরা জয় পান।
এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় ডাকসু নেতৃত্বের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন সামনে আসে। বিশেষ করে সাদিক কায়েমকে ঘিরে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এ আলোচনাকে আরও জোরালো করে।
ভূমিকম্পের সময় ক্লাস বন্ধ ও রাজনৈতিক প্রচারণার অভিযোগ
ডাকসুতে শিবির-সমর্থিত নেতৃত্বের বিজয়ের পর ভূমিকম্পকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-কার্যক্রম বন্ধ এবং পরবর্তী সময়ে সেই পরিস্থিতিকে জামায়াতের নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা হয়।
এ বিষয়ে সাবেক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও ডাকসু নির্বাচনের প্রার্থী আব্দুল কাদেরও প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এই প্রতিবেদনের জন্য ওই বক্তব্যের পূর্ণ প্রাথমিক উৎস স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে বিষয়টি অভিযোগ ও রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই বিবেচ্য।
সাদিক কায়েমের শিবির থেকে জামায়াতে যোগদান
ঘটনাপ্রবাহের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমের শিবিরের দায়িত্ব ছাড়ার পর জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে যোগ দেওয়া।
১৩ জুলাই ২০২৬ সাদিক কায়েম ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংগঠনের নিয়মিত সাংগঠনিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবেই তাঁর দায়িত্বের সমাপ্তি হয়েছে।
এর একদিন পর, ১৫ জুলাই, তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। একই সময়ে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের খবরও প্রকাশিত হয়।
এর আগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সাদিক কায়েমের নাম আলোচনায় ছিল। ১৩ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে প্রথম আলো জানায়, জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ শাখা তাঁকে মেয়র পদে মনোনীত করেছে বলে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ জানিয়েছেন। একই প্রতিবেদনে তিনি বলেন, ছাত্রজীবন শেষ হওয়া বা কর্মজীবনে প্রবেশের মতো কারণে শিবির থেকে বিদায় নেওয়ার সাংগঠনিক রীতি রয়েছে।
পরবর্তীতে সাদিক কায়েমকে জামায়াতের নির্বাচনী কর্মসূচিতে বক্তব্য দিতেও দেখা যায়। ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারির এক অনুষ্ঠানের প্রতিবেদনে বাসস তাঁকে জামায়াত আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দিতে এবং জামায়াতের নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশের কথা বলতে উদ্ধৃত করেছে।
তাহলে প্রশ্ন কোথায়?
এই ধারাবাহিকতা সামনে রেখে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও সমালোচকদের একটি অংশ প্রশ্ন তুলছেন—শিবির যদি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সাংগঠনিকভাবে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন একটি স্বতন্ত্র ছাত্রসংগঠন হয়, তাহলে শিবিরের শীর্ষ পর্যায়ের দায়িত্বশীল একজন নেতার ছাত্রসংগঠনের দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরপরই জামায়াতে যোগ দেওয়া এবং দলটির নির্বাচনী রাজনীতিতে যুক্ত হওয়াকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে?
অন্যদিকে, শিবিরের অবস্থান হলো—সংগঠনে দায়িত্ব পালনকালে কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই; দায়িত্ব শেষ করে যে কেউ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে অন্য রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে পারেন। ২০২৬ সালের মে মাসে শিবিরের এক বিজ্ঞপ্তিতে এমন অবস্থান জানানো হয়েছিল।
অর্থাৎ, এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন—সাংগঠনিক সম্পর্ক এবং ব্যক্তির পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান।
একজন ব্যক্তি ছাত্রসংগঠনের দায়িত্ব শেষ করে কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে পারেন—এটি তাঁর রাজনৈতিক অধিকার। কিন্তু সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রসংগঠন ও মূল রাজনৈতিক দলের মধ্যকার সম্পর্কের প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
‘লেজুড়বৃত্তিক নয়’ দাবির বাস্তবতা নিয়ে বিতর্ক
ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শিবিরের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয়ের যে বক্তব্য সামনে এসেছিল, সাদিক কায়েমের রাজনৈতিক যাত্রাপথ সেই বক্তব্যকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
একদিকে রয়েছে শিবিরের সাংগঠনিক স্বাতন্ত্র্যের দাবি। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে—শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন ব্যক্তি ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হওয়ার পর শিবিরের দায়িত্ব ছেড়ে জামায়াতে যোগ দিয়েছেন এবং জামায়াতের নির্বাচনী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।
তবে এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে সরাসরি কোনো সাংগঠনিক সম্পর্কের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক কাঠামো, নীতিমালা ও দায়িত্বের প্রকৃতি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
রাজনীতিতে শুধু স্লোগান নয়—কোন সংগঠনের সঙ্গে কার সাংগঠনিক সম্পর্ক, দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর রাজনৈতিক গন্তব্য কী এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো নিজেদের সম্পর্ককে কীভাবে ব্যাখ্যা করে—এসব বিষয়ও জনআলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সাদিক কায়েমকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ তাই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি শিবিরের ‘অ-লেজুড়বৃত্তিক’ পরিচয় ও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তার সম্পর্কের প্রকৃতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
শেষ পর্যন্ত এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট সংগঠন ও নেতাদের কাছ থেকেই স্পষ্টভাবে আসা প্রয়োজন।